স্বামী শিষ্য সংবাদ ০৮

 ৮

স্থান — আলমবাজার মঠ

কাল — মে, ১৮৯৭

স্বামী শিষ্য সংবাদ ০৮

স্বামীজীকে শিষ্যের রন্ধন করিয়া ভোজন করান— ধ্যানের স্বরূপ ও অবলম্বন সম্বন্ধে কথা—বহিরালম্বন ধরিয়াও মন একাগ্র করিতে পারা যায়—মন একাগ্র হইবার পরেও সাধকের মনে বাসনার উদয় পূর্ব্বসংস্কারবশতঃ হইয়া থাকেমনের একাগ্রতায় সাধকের ব্রহ্মাভাস ও নানা প্রকার বিভূতিলাভের দ্বার খুলিয়া যায়—ঐ সময়ে কোনরূপ বাসনাদ্বারা চালিত হইলে তাহার ব্রহ্মজ্ঞানলাভ হয় না । 



কয়েক দিন হইল স্বামীজী ৺বলরাম বসুর বাগবাজারে বাড়ীতে অবস্থান করিতেছেন। প্রাতে, দ্বিপ্রহরে বা সন্ধ্যায় তাঁহার কিঞ্চিন্মাত্রও বিরাম নাই; কারণ বহু উৎসাহী যুবককলেজের বহু ছাত্র—তিনি এখন যেখানেই থাকুন না কেন, তাঁহাকে দর্শন করিতে আসিয়া থাকে। স্বামীজী সকলকেই সাদরে ধর্ম্ম ও দর্শনের জটিল তত্ত্বগুলি সহজ ভাষায় বুঝাইয়া দেন; স্বামীজীর প্রতিভার নিকট তাহারা সকলেই যেন অভিভূত হইয়া নীরবে অবস্থান করে । 

আজ সূর্য্যগ্রহণ—সৰ্ব্বগ্রাসী গ্রহণ। জ্যোতিব্বিদগণও গ্রহণ দেখিতে নানাস্থানে গিয়াছেন। ধর্মপিপাসু নরনারীগণ গঙ্গাস্নান করিতে বহুদূর হইতে আসিয়া উৎসুক হইয়া গ্রহণবেলা প্রতীক্ষা করিতেছেন। স্বামীজীর কিন্তু গ্রহণসম্বন্ধে বিশেষ কোন উৎসাহ নাই ৷ শিষ্য আজ স্বামীজীকে নিজহস্তে রন্ধন করিয়া খাওয়াইবে— স্বামীজীর আদেশ। মাছ, তরকারি ও রন্ধনের উপযোগী অন্যান্য দ্রব্যাদি লইয়া বেলা ৮টা আন্দাজ সে ৺বলরাম বাবুর বাড়ী উপস্থিত হইয়াছে। তাহাকে দেখিয়া স্বামীজী বলিলেন, “তোদের দেশের মত রান্না করতে হবে; আর গ্রহণের পূর্ব্বেই খাওয়া দাওয়া শেষ হওয়া চাই ।” 

বলরাম বাবুদের বাড়ীতে মেয়েছেলেরা কেহই এখন কলিকাতায় নাই। সুতরাং বাড়ী একেবারে খালি। শিষ্য বাড়ীর ভিতরে রন্ধন-শালায় গিয়া রন্ধন আরম্ভ করিল । শ্রীরামকৃষ্ণগতপ্রাণা যোগীনমাতা নিকটে দাঁড়াইয়া শিষ্যকে রন্ধন-সম্বন্ধীয় সকল বিষয় যোগাড় দিতে ও সময়ে সময়ে দেখাইয়া দিয়া সাহায্য করিতে লাগিলেন এবং স্বামীজী মধ্যে মধ্যে ভিতরে আসিয়া রান্না দেখিয়া তাহাকে উৎসাহিত করিতে লাগিলেন; আবার কখনও বা “দেখিস্ ‘মাছের জুল’ যেন ঠিক বাঙ্গালদিশি ধরণে হয়” বলিয়া রঙ্গ করিতে লাগিলেন । 

ভাত, মুগের দাল, কৈ মাছের ঝোল, মাছের টক ও মাছের সুক্তনি রান্না প্রায় শেষ হইয়াছে, এমন সময় স্বামীজী স্নান করিয়া আসিয়া নিজেই পাতা করিয়া খাইতে বসিলেন। এখনও রান্নার কিছু বাকী আছে—বলিলেও শুনিলেন না, আবদেরে ছেলের মতন বলিলেন, “যা হয়েছে শীগগির নিয়ে আয়, আমি আর বসতে পাচ্ছি নে, খিদেয় পেট জ্বলে যাচ্ছে।” শিষ্য কাজেই তাড়াতাড়ি আগে স্বামীজীকে মাছের সুক্তনি ও ভাত দিয়ে গেল, স্বামীজীও তৎক্ষণাৎ খাইতে আরম্ভ করিলেন । অনন্তর শিষ্য বাটিতে করিয়া স্বামীজীকে অন্য সকল তরকারি আনিয়া দিবার পর যোগানন্দ, প্রেমানন্দ প্রমুখ অন্যান্য সন্ন্যাসী মহারাজগণকে অন্ন-ব্যঞ্জন পরিবেশন করিতে লাগিল । ` শিষ্য কোনকালেই রন্ধনে পটু ছিল না; কিন্তু স্বামীজী আজ তাহার রন্ধনের ভূয়সী প্রশংসা করিতে লাগিলেন। কলিকাতার লোক মাছের সুক্তনির নামে খুব ঠাট্টা তামাসা করে কিন্তু তিনি সেই সুক্তনি খাইয়া খুশি হইয়া বলিলেন -“এমন কখনও খাই নাই ! কিন্তু মাছের 'জুল’টা যেমন ঝাল হয়েছে, এমন আর কোনটাই হয় নাই।” টকের মাছ খাইয়া স্বামীজী বলিলেন, “এটা ঠিক যেন বর্দ্ধমানী ধরণের হয়েছে।” অনন্তর দধি সন্দেশ গ্রহণ করিয়া স্বামীজী ভোজন শেষ করিলেন এবং আচমনাস্তে ঘরের ভিতর খাটের উপর উপবেশন করিলেন। শিষ্য স্বামীজীর সম্মুখের দালানে প্রসাদ পাইতে বসিল । স্বামীজী তামাক টানিতে টানিতে বলিলেন, “যে ভাল রাঁধতে পারে না, সে ভাল সাধু হতে পারে না—মন শুদ্ধ না হলে ভাল সুস্বাদু রান্না হয় না ।” 

কিছুক্ষণ পরে চারিদিকে শাঁক ঘণ্টা বাজিয়া উঠিল এবং স্ত্রীকণ্ঠের উলুধ্বনি শুনা যাইতে লাগিল। স্বামীজী বলিলেন, “ওরে গেরণ লেগেছে--আমি ঘুমোই, তুই আমার পা টিপে দে।” এই বলিয়া একটুকু তন্দ্রা অনুভব করিতে লাগিলেন। শিষ্যও তাহার পদসেবা করিতে করিতে ভাবিল, 'এই পুণ্যক্ষণে গুরুপদ - সেবাই আমার গঙ্গাস্নান ও রূপ।' এই ভাবিয়া শিষ্য শান্ত মনে স্বামীজীর পদসেবা করিতে লাগিল । গ্রহণে সৰ্ব্বগ্রাস হইয়া ক্ৰমে চারিদিক সন্ধ্যাকালের মত তমসাচ্ছন্ন হইয়া গেল । 

গ্রহণ ছাড়িয়া যাইতে যখন ১৫/২০ মিনিট বাকী আছে, তখন স্বামীজী উঠিয়া মুখ হাত ধুইয়া তামাক খাইতে খাইতে শিষ্যকে পরিহাস করিয়া বলিতে লাগিলেন, “লোকে বলে, গেরণের সময় যে যা করে সে তাই নাকি কোটীগুণে পায়—তাই ভাবলুম, মহামায়া এ শরীরে সুনিদ্রা দেন নাই, যদি এই সময় একটু ঘুমুতে পারি ত এর পর বেশ ঘুম হবে, কিন্তু তা হল না; জোর ১৫ মিনিট ঘুম হয়েছে।” 

অনন্তর সকলে স্বামীজীর নিকট আসিয়া উপবেশন করিলে স্বামীজী শিষ্যকে উপনিষদ্ সম্বন্ধে কিছু বলিতে আদেশ করিলেন। শিষ্য ইতঃপূর্ব্বে কখনও স্বামীজীর সমক্ষে বক্তৃতা করে নাই । তাহার বুক দূর দুর্ করিতে লাগিল। কিন্তু স্বামীজী ছাড়িবার পাত্র নহেন। সুতরাং শিষ্য উঠিয়া “পরাঞ্চি খানি ব্যতৃণ‍ স্বয়ম্ভূঃ” মন্ত্রটির ব্যাখ্যা করিতে লাগিল, পরে ‘গুরুভক্তি' ও 'ত্যাগের' মহিমা বর্ণন করিয়া ব্রহ্মজ্ঞানই যে পরম পুরুষার্থ, ইহা মীমাংসা করিয়া বসিয়া পড়িল। স্বামীজী পুনঃ পুনঃ করতালি দ্বারা শিষ্যের উৎসাহ- বৰ্দ্ধনার্থ বলিতে লাগিলেন, “আহা! সুন্দর বলেছে ।” 

অনন্তর শুদ্ধানন্দ, প্রকাশানন্দ প্রভৃতি কয়েকজন স্বামীকে স্বামীজী কিছু বলিতে আদেশ করিলেন। স্বামী শুদ্ধানন্দ ওজস্বিনী ভাষায় 'ধ্যান' সম্বন্ধে নাতিদীর্ঘ এক বক্তৃতা করিলেন । অনন্তর স্বামী প্রকাশানন্দ প্রভৃতিও ঐরূপ করিলে স্বামীজী উঠিয়া বাহিরের বৈঠকখানায় আগমন করিলেন । তখনও সন্ধ্যা হইতে প্রায় এক ঘণ্টা বাকি আছে। সকলে ঐ স্থানে আসিলে স্বামীজী বলিলেন, “তোদের কার কি জিজ্ঞাস্য আছে বল্‌ ।” 

শুদ্ধানন্দ স্বামী জিজ্ঞাসা করিলেন, “মহাশয়, ধ্যানের স্বরূপ কি ?” 

স্বামীজী। কোন বিষয়ে মনের কেন্দ্রীকরণের নামই ধ্যান। এক বিষয়ে একাগ্র করতে পারলে সেই মন যে-কোন বিষয়ে হোক না কেন, একাগ্র করতে পারা যায় । 


শিষ্য। শাস্ত্রে যে বিষয় ও নির্ব্বিষয়-ভেদে দ্বিবিধ ভাবের ধ্যান দৃষ্ট হয়, উহার অর্থ কি ? এবং উহার মধ্যে কোনটা বড় ? 

স্বামীজী। প্রথম কোন একটি বিষয় নিয়ে ধ্যান অভ্যাস করতে হয়। এক সময় আমি একটা কাল বিন্দুতে মনঃসংযম করতাম। ঐ সময়ে শেষে আর বিন্দুটাকে দেখতে পেতুম না, বা সামনে যে রয়েছে তা বুঝতে পারতুম না, মন নিরোধ হয়ে যেতো—কোন বৃত্তির তরঙ্গ উঠত না—যেন নিবাত সাগর। ঐ অবস্থায় অতীন্দ্রিয় সত্যের ছায়া কিছু কিছু দেখতে পেতুম। তাই মনে হয়, যে-কোন সামান্য বাহ্য বিষয় ধরে ধ্যান অভ্যাস করলেও মন একাগ্র বা ধ্যানস্থ হয়। তবে যাতে যার মন বসে, সেটা ধরে ধ্যান অভ্যাস করলে মন শীঘ্র স্থির হয়ে যায়। তাই এদেশে এত দেবদেবীমূর্তির পূজা। এই দেবদেবীর পূজা থেকে আবার কেমন art develop ( শিল্পের উন্নতি ) হয়েছিল ! যাক্ এখন সে কথা। এখন কথা হচ্ছে যে, ধ্যানের বহিরালম্বন সকলের সমান বা এক হতে পারে না। যিনি যে বিষয় ধরে ধ্যানসিদ্ধ হয়ে গেছেন, তিনি সেই বহিরালম্বনেরই কীৰ্ত্তনও প্রচার করে গেছেন। তারপর কালে তাতে মনঃস্থির করতে হবে, একথা ভুলে যাওয়ায় সেই বহিরালম্বনটাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপায়টা ( means ) নিয়েই লোকে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, উদ্দেশ্যটার (end) দিকে লক্ষ্য কমে গেছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে মনকে বৃত্তিশূন্য করা—তা কিন্তু কোন বিষয়ে তন্ময় না হলে হবার জো নাই । 


শিষ্য। মনোবৃত্তি বিষয়াকারা হইলে তাহাতে আবার ব্রহ্মের ধারণা কিরূপে হইতে পারে ? 

স্বামীজী। বৃত্তি প্রথমতঃ বিষয়াকারা বটে, কিন্তু ঐ বিষয়ের জ্ঞান থাকে না; তখন শুদ্ধ 'অস্তি' এই মাত্র বোধ থাকে । 

শিষ্য। মহাশয়, মনের একাগ্রতা হইলেও কামনা বাসনা উঠে কেন ? 

স্বামীজী। ওগুলি পূর্ব্বের সংস্কারে হয় । বুদ্ধদেব যখন সমাধিস্থ হতে যাচ্ছেন, তখন মারের অভ্যুদয় হল । মার বলে একটা কিছু বাইরে ছিল না, মনের প্রাকসংস্কারই ছায়ারূপে বাহিরে প্রকাশ হয়েছিল। 

শিষ্য । তবে যে শুনা যায়, সিদ্ধ হইবার পূর্ব্বে নানা বিভীষিকা দেখা যায়, তাহা কি মনঃকল্পিত ? 

স্বামীজী। তা নয় ত কি ? সাধক অবশ্য তখন বুঝতে পারে না যে, এগুলি তার মনেরই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু বাইরে কিছুই নাই । এই যে জগৎ দেখছিস্‌, এটাও নাই । সকলি মনের কল্পনা ৷ মন যখন বৃত্তিশূন্য হয়, তখন তাতে ব্রহ্মাভাস - দর্শন হয়। “যং যং লোকং মনসা সম্বিভাতি” সেই সেই লোক দর্শন করা যায় । যা সঙ্কল্প করা যায়, তাই সিদ্ধ হয় ৷ ঐরূপ সত্যসঙ্কল্প অবস্থা লাভ হলেও যে সমনস্ক থাকতে পারে ও কোন আকাঙ্ক্ষার দাস হয় না, সে-ই ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করে। আর ঐ অবস্থা লাভ ক'রে যে বিচলিত হয়, সে নানা সিদ্ধি লাভ ক'রে পরমার্থ হতে ভ্ৰষ্ট হয় ৷ 


এই কথা বলিতে বলিতে স্বামীজী পুনঃ পুনঃ 'শিব' 'শিব' নাম উচ্চারণ করিতে লাগিলেন। অবশেষে আবার বলিলেন, “ত্যাগ ভিন্ন এই গভীর জীবন-সমস্যার রহস্যভেদ কিছুতেই হবার নহে। ত্যাগ-ত্যাগ — ত্যাগ, ইহাই যেন তোদের জীবনের মূলমন্ত্র হয়। ‘সৰ্ব্বং বস্তু ভয়ান্বিতং ভুবি নৃণাং বৈরাগ্যমেবাভয়ম্'।” 

-------::-------

Post a Comment

0 Comments