আত্মা ও জড় - আত্মজ্ঞান

 আত্মা ও জড়

(Spirit and Matter) 

    আত্মা ও জড় সম্বন্ধে বিচার সভ্য জগতের সকল বিজ্ঞান, দর্শনশাস্ত্র এবং ধর্ম্মশাস্ত্রের মুখ্য আলোচনার বিষয়। বিভিন্ন দেশের মনীষিগণ উক্ত দুই শব্দের প্রকৃত অর্থ এবং উহাদের পরস্পরের সম্বন্ধ নির্ণয় করিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছেন । ঐ দুইটি নামের বিবিধ সংজ্ঞা প্রচলিত আছে, যথা :- জীবাত্মা ও জড় (ego and non-ego), জ্ঞাতা ও জ্ঞেয় (subject and object), পুরুষ ও প্রকৃতি (soul or mind and matter), চেতন ও অনাত্মা ইত্যাদি। যুগে যুগে যাবতীয় বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক পণ্ডিতগণ এই সম্বন্ধে তাঁহাদের ভাব ও ধারণার অনুকুলে নানাবিধ যুক্তিতর্কের অবতারণা করিয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন। ইহাদের মধ্যে কেহ কেহ বলেন যে, আত্মা, মন বা পুরুষ হইতেই অনাত্মা, জড়, অচেতন পদার্থ সমূহ উদ্ভত হইয়াছে। পক্ষান্তরে, জড়বাদীরা বলিয়া থাকেন যে, অনাত্ম জড় পদার্থ হইতে আত্মা, মন বা পুরুষের উৎপত্তি হইয়াছে। এইপ্রকার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত হইতে এই নিখিল বিশ্বসৃষ্টি সম্বন্ধে নানাবিধ মতবাদের উদ্ভব হইয়াছে। ঐ মতগুলি সংখ্যায় অধিক হইলেও সাধারণতঃ তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত হইতে পারে। যথা— অধ্যাত্মবাদ বা বিজ্ঞানবাদ, জড়বাদ এবং অদ্বৈতবাদ। অধ্যাত্মবাদী বা বিজ্ঞানবাদিগণ বলেন যে, আত্মা বা মন জড়জগতের ও অচেতন শক্তির সৃষ্টিকর্তা। * [“মনো হি জগতাং কর্তা, মনো হি পুরুষঃ স্মৃতঃ।”, যোগবাশিষ্ট]

সুতরাং আত্মাই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সর্ব্বপ্রকার পদার্থেরও সৃষ্টিকর্তা। অতএব ইহাদের মতে অনাত্মা বা জড়জগৎ আত্মা বা চৈতন্যের একটি অবস্থান্তর ভিন্ন আর কিছুই নহে। পক্ষান্তরে, জড়বাদিগণ বলেন যে, অচেতন, অনাত্মা বা জড় হইতেই চৈতন্যের বা আত্মার উদ্ভব হইয়াছে ৷ 


    বিভিন্ন দেশে সময় সময় বহু অধ্যাত্মবাদী বা বিজ্ঞানবাদী দার্শনিক পণ্ডিতগণের আবির্ভাব হইয়াছে। ভারতবর্ষে গ্রীসে, জার্মানীতে এবং ইংলণ্ডে বিশপ বার্কলের ন্যায় বহু বিজ্ঞানবাদী দার্শনিক জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। তাঁহারা এই প্রতীয়মান বাহ্য জগতের এবং জড়ের সত্ত্বা স্বীকার করেন নাই । তাঁহাদের মতে এই জড়জগৎ সমস্তই মনের ভাব মাত্র। মার্কিন দেশের আধুনিক খ্রীষ্টীয় বিজ্ঞানবাদীরা বলেন যে, জগতে জড় পদার্থ বলিয়া কোনও বস্তু নাই ; সমস্তই মনের কার্য্য । ইহারা বিশপ বার্কলে এবং সমশ্রেণীভুক্ত অন্যান্য বিজ্ঞানবাদী দার্শনিক পণ্ডিতের ধারণার অনুবর্ত্তী হইয়া এইরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন। আমেরিকা মহাদেশে এই বিজ্ঞানবাদীর ভাব সম্পূর্ণ নূতন ; কারণ আমেরিকাবাসিগণ জগতের অপর জাতি অপেক্ষা আধুনিক। আমেরিকাতে এ পৰ্যন্ত কোনও প্রতিভাশালী বিজ্ঞানবাদী দার্শনিক পণ্ডিতের আবির্ভাব হয় নাই।

[বিশপ বার্কলে ইংল্যান্ডের একজন বিখ্যাত দার্শনিক ছিলেন।]  


    পক্ষান্তরে, অধুনা অধিকাংশ বৈজ্ঞানিক, শরীরতত্ত্ববিৎ, জড়বিজ্ঞানবিৎ (Physicist), রসায়নশাস্ত্রবিৎ, চিকিৎসা-ব্যবসায়ী এবং ক্রমবিকাশবাদী এই বিশ্ব সম্বন্ধে জড়বাদের সমর্থন করিয়া থাকেন। সমস্ত পদার্থের উপাদান কারণ ‘জড়-পদার্থ’—ইহা তাঁহারা দেখাইতে প্রয়াস পান। তাঁহারা আরও বলেন যে, জড়-পদার্থ হইতে মন ও আত্মার উৎপত্তি হইয়াছে। যদিও জগতে কোটি কোটি লোক এই সিদ্ধান্তের অনুমোদন করেন এবং জড়বাদী বলিয়া আপনাদের পরিচয় দিয়া থাকেন, তথাপি তাঁহাদের ভিতর বোধ হয় অতি অল্পসংখ্যক লোকেই জড় অথবা অনাত্মার স্বরূপ কি, কিম্বা অনাত্মা বা জড় বলিতে কি বুঝায়, তাহা পরিস্ফুট ভাবে প্রকাশ করিতে পারেন। অনাত্মা বা জড় এই পদার্থটির স্বরূপ কেহ কি কখন প্রত্যক্ষ করিয়াছেন ? জড়বাদিগণকে জিজ্ঞাসা করা যাইতে পারে যে, আমরা কি জড় পদার্থ দেখিতে পাই ? উত্তরে 'না' বলিতে হইবে, । কারণ চক্ষু দ্বারা আমরা সাধারণতঃ যাহা দেখি তাহা 'বর্ণ' ভিন্ন অন্য কিছুই নহে। এই বর্ণ এবং জড় কি একই পদার্থ ? কখনই না। বর্ণ একটি গুণ বিশেষ ; উহা কোথায় থাকে ? সাধারণ অনভিজ্ঞ লোকের বিশ্বাস এই যে, পুষ্পের বর্ণ আমরা যাহা প্রত্যক্ষ করি, তাহা সেই পুষ্পের মধ্যেই নিহিত আছে । কিন্তু শরীরতত্ত্ববিদ্‌গণ বলেন যে, ঐ বর্ণ যাহা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় তাহার বাস্তবিক কোনও পৃথক অস্তিত্ব নাই। উহা একপ্রকার অনুভূতিমাত্র (sensation) । আলোক-রশ্মির কম্পন-বিশেষ পুষ্পে প্রতিফলিত হইয়া অক্ষিপট (retina) ও দর্শন-নাড়ীর (optic nerves ) সাহায্যে মস্তিষ্কে প্রবেশ করিলে এবম্বিধ অনুভূতি উৎপন্ন করে। এই প্রকার ব্যাখ্যা সাধারণ লোক অদ্ভুত বলিয়া মনে করিতে পারে । কিন্তু ইহা বৈজ্ঞানিক সত্য ৷ 'ইথার’ নামক পদার্থের ('আকাশ' তম্মামাত্রার) আণবিক-কম্পন চক্ষুর মধ্য দিয়া সঞ্চালিত হইয়া মস্তিষ্কের কোষগুলির মধ্যে অন্য এক প্রকার কম্পনের সৃষ্টি করে। উহা আমাদের চৈতন্যময় পুরুষের (Conscious ego) সাহায্যে বর্ণ-বিশেষের অনুভূতি করায় ; সুতরাং বাহ্য-প্রকৃতি (জ্ঞেয়) ও অন্তঃপ্রকৃতির (জ্ঞাতার) উপাদান 'সমুহের সংমিশ্রণের ফলেই বর্ণ-বিশেষের জ্ঞান জন্মে ; অর্থাৎ বাহ্য-জগৎ হইতে সম্প্রাপ্ত জ্ঞেয় বস্তুর কম্পনের সহিত মানসিক অনুভূতির সম্মিলনেই বর্ণের উপলব্ধি হইয়া থাকে । এইরূপে আমরা বুঝিতে পারি যে, পুষ্পের বর্ণ পুষ্পের মধ্যে নিহিত  নহে ; পরন্তু উহার উপলব্ধি অক্ষিপটের, চক্ষুর অন্তর্গত দর্শন-নাড়ীর এবং মস্তিষ্কান্তর্গত ক্ষুদ্র কোষ সমূহের (brain cells) উপর নির্ভর করে। সুতরাং চক্ষুগ্রাহ্য বর্ণটি ইংরাজী শব্দ matter (জড়) বলিতে যাহা বুঝায় তাহা হইতে পারে না। 


    এইরূপে প্রশ্ন হইতে পারে যে, যে শব্দটি আমরা শ্রবণ করিয়া থাকি, তাহাই কি জড় ? না, তাহা নহে। ইহাও আকাশ-স্থিত বায়ুর কম্পন ও চেতনা-সংযুক্ত মানসিক ক্রিয়ার সম্মিলনের ফলস্বরূপ। গভীর নিদ্রাবস্থাতে শব্দরূপ বায়ুর কম্পন আমাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করিয়া শ্রবণেন্দ্রিয়ের মধ্য দিয়া মস্তিষ্কস্থ ক্ষুদ্র কোষ সমূহে পৌঁছায়। কিন্তু আমরা তখন কিছুই শুনিতে পাই না। কারণ, উপলব্ধি-করণক্ষম মন তখন শ্রবণেন্দ্রিয় হইতে অসংযুক্ত থাকায় শব্দের অনুভূতি উদ্রেক করিতে পারে নাই। সুতরাং শব্দকেও আমরা জড় পদার্থ বলিতে পারি না।* [এই প্রকারে দেখাইতে পারা যায় যে, জড় পদার্থ আমাদের পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়ের বিষয়ীভূত কখনও হইতে পারে না ।]  তাহা হইলে জিজ্ঞাস্য হইতে পারে যে, তবে জড় বা অনাত্ম বস্তুটি কি ? 


    ইংরেজ বৈজ্ঞানিক জন ষ্টুয়ার্ট মিলের মতে রূপ, শব্দ প্রভৃতি উপলব্ধির—নিত্যসম্ভাবনা (permanent possibility of sensation) ইহাই 'জড়' সংজ্ঞার প্রকৃত অর্থ । এবং অনুভূতির নিত্য-সম্ভাব্যতার (permanent possibility of feeling) নাম 'মন' বা চৈতন্যময় আত্মা (mind)। মিল সাহেবের এই ব্যাখ্যা শুনিয়া আমাদের জড় সম্বন্ধে ধারণা কি নির্ভুল ও জটিলতা-শূন্য হইল ? না, পক্ষান্তরে ইহা আরও দুৰ্ব্বোধ্য হইয়া উঠিল। উপরিউক্ত ব্যাখ্যার মধ্যে 'সম্ভাবনা' (possibility) এই শব্দটি মনে সংশয় উৎপাদন করে। ইহা পরিষ্কার ভাবে বুঝাইতে হইলে বলিতে হয় যে, যাহা নিত্য অর্থাৎ সর্ব্ব সময়ে এবং সকল অবস্থাতে জ্ঞেয় থাকে এবং যাহার অনুভব সম্ভবপর হয় তাহাই জড় পদার্থ । পক্ষান্তরে, যাহাতে নিত্য অর্থাৎ সকল সময়ে ও সকল অবস্থাতে অনুভূতি সম্ভবপর হয় তাহাই চৈত্যন্যময় আত্মা বা মন। অথবা অর্থটি আরও পরিস্ফুট ভাবে বলিতে গেলে বলা যাইতে পারে যে, যাহা সর্ব্বদা ইন্দ্রিয়ানুভূতির বিষয়, তাহাই জড় পদার্থ। অথবা ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য বিষয় মাত্রই জড় ; এবং যিনি অনুভব কৰ্ত্তা, বিষয়ী তিনিই আত্মা বা চৈতন্যময় পুরুষ (Spirit) ।


    যাহা নিরন্তরভাবে ইন্দ্রিয়ানুভূতি উৎপাদন-করণক্ষম, তাহার স্বরূপ প্রকাশ করিতে স্থুল বহিরিন্দ্রিয়সমূহ একেবারেই অসমর্থ। ঐ সমস্ত ইন্দ্রিয় কেবলমাত্র বিষয়ানুভূতির উন্মুক্ত প্রবেশদ্বার স্বরূপ ৷ আমরা জড় সম্বন্ধে কেবল এইমাত্র বলিতে পারি যে, উহা অনুভূতি উৎপন্ন করে, অর্থাৎ জড়পদার্থ জ্ঞানের উত্তেজক কারণ। যখন আমরা জড়ের স্বরূপ লক্ষণ জানিতে চেষ্টা করি, অথবা তৎসংক্রান্ত বিশেষ তথ্য নির্ণয় করিতে ইচ্ছুক হই, তখন আমরা ইন্দ্রিয়গণের দ্বারা এই বিষয়ে কোনও সাহায্য পাই না। চক্ষুদ্বয় দ্বারা কেবল রূপ দেখিতে পারা যায় ; কর্ণদ্বয় যারা কেবল শব্দ শুনিতে পাওয়া যায় ; নাসিকাদ্বয় দ্বারা গন্ধ অনুভব করা যায়। এইরূপে আমাদের পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় স্বাদ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ উপলব্ধি করিবার জন্য যন্ত্র স্বরূপে ব্যবহৃত হইয়া থাকে, অর্থাৎ উহারা জড়ের জ্ঞাপক মাত্র ; জড়ের স্বরূপ নির্ণয়ে অসমর্থ । বাহ্য জগতের সমস্ত পদার্থের অনুভূতি আমাদের এই সকল জ্ঞানেন্দ্রিয়ের ক্ষমতা অনুযায়ী সীমাবদ্ধ। বলা বাহুল্য, সৰ্ব্বপ্রকার বিষয়জ্ঞান আমাদের ইন্দ্রিয়বৃত্তিগুলির পরিচালনার মুখ্য বা গৌণ ফল স্বরূপ । যদিও আমরা জানি যে, জড় নামক পদার্থটি দেশ ও কাল দ্বারা পরিচ্ছিন্ন এবং উহা নানাপ্রকার বিষয়ানুভূতির কারণ স্বরূপ, তথাপি ইহাকে আমরা চক্ষু দ্বারা দেখিতে পাই না, বা হস্তদ্বারা স্পর্শ করিতে পারি না। এই জড় পদার্থকে যে কোনও নামে অভিহিত করা যাউক না কেন, উহা সকল সময়ে অতীন্দ্রিয় থাকিবে। আমরা 'একটি কেদারা অথবা একখও কাষ্ঠ বা স্বর্ণ স্পর্শ করিতে পারি, কিন্তু জড় বা অনাত্মার স্বরূপটি কখনও স্পর্শ করিতে পারি না। ইহা অতীব বিচিত্র। স্বর্ণ বা প্রস্তর খণ্ড জড় (matter) নহে। কিন্তু উহাদের উপাদান কারণ যে জড় পদার্থ তাহাকেই ‘ম্যাটার' বলা যায়। সেই অতীন্দ্রিয় জড় উপাদানটি কাষ্ঠ বা প্রস্তরখগুরূপে প্রতীয়মান হয় মাত্র । 


    ইংরেজী ভাষায় ‘ম্যাটার' (জড় বা অনাত্মা) যাহাকে বলে, সেই 'ম্যাটার' শব্দটির ব্যুৎপত্তি ও ইতিহাস সকলেরই জানা আবশ্যক। ইহা ল্যাটিন ভাষার Materies (মেটিরিস) শব্দ হইতে উৎপন্ন ৷ এই ল্যাটিন শব্দের অর্থ কোন এক বস্তুর ‘উপাদান' । প্রথমে এই শব্দটি বৃক্ষের গুঁড়ি বা গৃহাদি নিৰ্ম্মানো-পযোগী কড়িকাষ্ঠ, বরগা ইত্যাদি বস্তুর পরিবর্তে ব্যবহৃত হইত।


    ক্রমশঃ একপ্রকার বিশেষ অর্থ হইতে সাধারণ সংজ্ঞা-জ্ঞাপক ভাবে উহার অর্থ পরিবর্তিত হয়—অর্থাৎ যে কোনও পদার্থকে বিভিন্ন আকারে পরিবর্তিত করিলে উহার রূপান্তরিত প্রত্যেক অবস্থা ভিন্ন ভিন্ন নামে অভিহিত হয় বটে, কিন্তু ফলতঃ মূল পদার্থটি যাহা তাহাই থাকে । এই মূল পদার্থকে ‘ম্যাটার' বলা হইত। দৃষ্টান্তস্বরূপ একটি কাষ্ঠের মূর্ত্তি নির্ম্মিত হইলে, মূর্তিটিকে ‘মেটিরিস্' না বুঝাইয়া উপাদান কাষ্ঠকেই ‘মেটিরিস্' বলিয়া বুঝাইত। এইরূপে প্রস্তর, লোহা প্রভৃতি ধাতু হইতে বিভিন্ন আকারের মূর্ত্তি গঠিত হইলে উহাদের মূল উপাদান পদার্থকেই 'মেটিরিস্' নামে অভিহিত করা হইত। তদনুসারে পরে যখন মানব হৃদয়ে প্রশ্ন উঠিল যে, এই জগৎ কোন্ বস্তু দ্বারা নির্ম্মিত ? উত্তরে বলা হইল যে, 'মেটিরিস্’ বা ‘ম্যাটার' হইতেই এই জগৎ নিৰ্ম্মিত হইয়াছে । অতএব দেখা যাইতেছে যে, 'ম্যাটার' বলিতে বিশেষরূপে নিশ্চিত কোনও বস্তুকে বুঝাইতেছে না। সুতরাং এই শব্দটি কোনও অজ্ঞাত বস্তুকে বুঝায় যাহা হইতে ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য বিষয়- গুলি উৎপন্ন হইয়াছে। সেই অজ্ঞাত বস্তুটির সংজ্ঞা বা নাম দিবার জন্য 'matter' শব্দটি ব্যবহৃত হইয়া থাকে । ব্যুৎপত্তি অনুযায়ী ‘ম্যাটার' শব্দের ইহাই প্রকৃত অর্থ।  


    ইংরেজী ভাষায় চলিত কথোপকথনে কোন অজ্ঞাত বস্তুর উদ্দেশ্যে ‘ম্যাটার’ শব্দ ব্যবহৃত হইয়া থাকে; যেমন “what is the matter” ? কি ঘটিয়াছে ? “It does not matter ইহাতে ক্ষতি নাই। “ Important matter” আবশ্যকীয় বস্তু। “Decaying matter” পচা জিনিস ইত্যাদি । 


    পাশ্চাত্য জড়বিজ্ঞান ও দর্শনশাস্ত্রে 'ম্যাটার' শব্দের অর্থ সেই অজ্ঞাত বস্তু যাহা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যাবতীয় আকারবিশিষ্ট পদার্থের উপাদানস্বরূপ। সেই অতীন্দ্রিয় উপাদান কারণই জড় বা 'অনাত্মা' শব্দসকল দ্বারা বুঝিতে হইবে । ইহাই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য (রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ, স্পর্শ) বিষয় হইতে সম্পূর্ণ- রূপে পৃথক্ অজ্ঞাত পদার্থ । ইহা যদিও আমাদের ইন্দ্রিয়- গ্রাহ্য নহে, তথাপি ইহা এই বিশ্বজগতের সমস্ত পদার্থে মূল উপাদানরূপে অন্তর্নিহিত রহিয়াছে। 


    ‘দেশ' অথবা ‘কাল’ বলিতে আমরা যাহা বুঝি, 'ম্যাটার' জড় বা অনাত্ম পদার্থ ঠিক্ তাহা নহে। তবে ইহা দেশকে ব্যাপিয়া থাকে এবং কালের অধীনে ইহার অভিব্যক্তি হয়। কিন্তু এই 'ম্যাটার' বা জড় পদার্থটি কার্য্য-কারণ-সম্বন্ধের পর্যায়ের (category of causality) মধ্যে পরিগণিত হইতে পারে না। অর্থাৎ ইহা কার্য্যকারণ প্রবাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নহে। ইহাকে ‘কাৰ্য্য’ অথবা ‘কারণ' বলা যাইতে পারা যায় না। এই সমস্ত ভাব ‘ম্যাটার' 'জড়' বা 'অনাত্মা' শব্দের অর্থের মধ্যে নিহিত আছে । জড় বা অনাত্মা বলিলে দেশ, কাল, নিমিত্তের সহিত ইহার সম্বন্ধ কিরূপ তাহা মনে রাখিতে হইবে। যখন আমরা এই স্থুল বাহ্যজগতের পদার্থসকল যে উপাদানে নির্ম্মিত তাহার বিষয় চিন্তা করি, তখন স্বতঃই আমাদের মনে এই ভাব উদিত হয় যে, উহা বিরাট,, মহান, অদ্ভুত, অলৌকিক ও নিত্যপরিবর্তনশীল শক্তি- বিশিষ্ট। কিন্তু আবার আমাদের মনে এই প্রশ্ন উঠে যে, সেই জগতের উপাদান ‘ম্যাটার' যাহাকে আমরা জড় বা অনাত্মা বলি তাহা কোন্ পদার্থ ? উহা এক অথবা বহু ? উত্তরে বলিতে হয় যে, ‘ম্যাটার,’ জড় অথবা অনাত্ম পদার্থ একটিমাত্র ; উহা বহু নহে। 'ম্যাটার' অনেক, একথা আমরা বলিতে পারি না। ইংরেজ বৈজ্ঞানিক হার্বার্ট স্পেন্সার বলেন :—‘ম্যাটার' জড় বা অনাত্ম পদার্থ সম্বন্ধে আমাদের মনে যে ধারণা হয় তাহা অতি সহজভাবে বুঝাইতে গেলে এইমাত্র বলা যাইতে পারে যে, যাহা দেশ বা আকাশ (space) ব্যাপিয়া থাকে এবং প্রতিরোধ- শক্তিসম্পন্ন তাহাই ‘ম্যাটার' জড় বা অনাত্মা। ইহা শূন্য আকাশ হইতে পৃথক ; শূন্য আকাশে কোনপ্রকার গতির প্রতিরোধ হয় না। *[First Principles by Herbert Spencer-p. 140]


    এখন জড়ের ও আকাশের বা দেশের (space) মধ্যে কি প্রভেদ তাহা বিচার করা যাউক। যাহার ব্যাপকত্ব অপ্রতিরোধ- কারী তাহাই 'আকাশ' বা দেশ, আর যাহা গতির প্রতিরোধক ও যাহা আকাশের বা দেশের মধ্যেই অবস্থিত তাহাই জড়, অনাত্মা। অর্থাৎ আকাশ বা দেশ এবং জড় বা অনাত্মা উভয়ই ব্যাপক। কিন্তু আকাশ বা দেশ সৰ্ব্বত্র ব্যাপক হইলেও উহা অপ্রতিরোধী বা গতিকে বাধা দেয় না; পরন্তু জড়, অনাত্মা আকাশের বা দেশের মধ্যেই অবস্থান করে । 


    হার্বার্ট স্পেন্সার আরও বলেন যে, “জড় ও আকাশ এই দুইটি অবিশ্লেষ্য মূলতত্ত্বের মধ্যে প্রতিরোধ বা বাধা দেওয়া কার্য্যই জড়ের মুখ্যগুণ, এবং ব্যাপকত্ব গৌণগুণ । দৃষ্টান্ত- স্বরূপ বলা যাইতে পারে যে, যখন আমরা কোনও বস্তু স্পর্শ করি তখন উহা আমাদের বাধা দেয় এবং হস্তের গতির প্রতিরোধক কিছু আছে ইহা আমাদের উপলব্ধি হয়। কিন্তু যখন আমরা সেই বস্তু স্পর্শ করিয়া হস্তপ্রসারণ করি, তখন এই বাধা বা প্রতিরোধের ভাব দেশের মধ্যে সম্প্রসারিত হয়।” তিনি আরও বলেন যে, “যাহা হইতে জড়ের বা অনাত্মার অস্তিত্বের ধারণা আমাদের হয়, তাহা একপ্রকার শক্তির কাৰ্য্য বলিয়া আমাদের উপলব্ধি হইয়া থাকে। অর্থাৎ যাহা আমাদের মাংসপেশী সঞ্চালনের সময় তৎস্থিত সুপ্তশক্তির প্রতিরোধ করে, সেই প্রতিরোধক শক্তির কথা স্বতঃই মনে জাগ্রত হয় । যে সুপ্তশক্তি ঐরূপ প্রতিরোধ করে তাহাকেই ব্যক্তশক্তি (force) বলা হয়। সুতরাং 'ম্যাটার', জড় বা অনাত্মা যাহাকে বলা যায় তাহা কেবল এই ব্যক্ত শক্তিগুলি দেশের সহিত একপ্রকার ঘনিষ্ট সম্বন্ধে আবদ্ধমাত্র—ইহাই বুঝিতে হইবে।” তিনি আরও বলেন যে, “ম্যাটার ও তাহার গতি ঐ শক্তিগুলির বিভিন্নপ্রকার অভিব্যক্তি মাত্র। জড় ও অনাত্মা- রূপ স্থূল পদার্থগুলি বাহ্যিক শক্তিসমটি ও আমাদের মানসিক উপলব্ধি সমূহ একত্রে সংমিশ্রিত হইয়া ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হইয়া থাকে।” প্রতিরোধ বা বাধা অনুভব করিবার জন্য এক সচেতন 'পুরুষ' থাকা আবশ্যক। এই অনুভব-করণক্ষম জ্ঞাতা (আত্মা) বিদ্যমান থাকিলেই প্রতিরোধমূলক শক্তিটি অনুভব করিতে পারা যায় এবং এই শক্তি হইতেই জড় বা অনাত্মা সম্বন্ধীয় ধারণা আমাদের জন্মিয়া থাকে । 


    জড় বা অনাত্মা কাহারও দ্বারা সৃষ্ট পদার্থ নহে। অসৎ বা শূন্য হইতে অনাত্মা বা জড়ের সৃষ্টি অথবা কোন কালে উহার অত্যন্তাভাব বা সম্পূর্ণরূপে বিলোপ কেহ কখনও দেখেন নাই এবং কল্পনাও করিতে পারেন নাই । আধুনিক বৈজ্ঞানিক মতানুসারে জড় অসত্য ও অবিনশ্বর। সংক্ষেপে বলিতে হইবে যে, ‘ম্যাটার' ( জড় বা অনাত্মা ) অসৎ বা শূন্য হইতে উৎপন্ন হয় নাই এবং ইহার ধ্বংস বা বিলোপও সম্ভবপর নহে । জড়, অনাত্মার আরও অনেক প্রকার ব্যাখ্যা আছে । পাশ্চাত্য প্রকৃতিতত্ত্ববিৎ বলেন যে, যাহা পারস্পরিক আকর্ষণ শক্তি সম্পন্ন তাহাই 'জড়'। কিন্তু এই সংজ্ঞা হইতেও জড়ের যথার্থস্বরূপ অবগত হওয়া যায় না। তবে আমরা এইমাত্র বলিতে পারি যে, হয়ত আকৃষ্ট হইলে প্রত্যাকর্ষণ করিবার শক্তিসম্পন্ন কোনও পদার্থ থাকিতে পারে। জাৰ্মাণ বৈজ্ঞানিক আর্নেষ্ট হেকেলও বলেন, “জড় বা অনাত্মা—অসীমরূপে ব্যাপ্ত হইয়া আছে এমন কোনও বস্তু বিশেষ এবং সর্ব্বভাব-গ্রাহিণী চিন্তাশক্তিই চৈতন্যময় আত্মা (Spirit)।” 


    এইপ্রকার বিবিধ সংজ্ঞাগুলির পর্যালোচনা করিয়া আমরা এই মাত্র বুঝিতে পারি যে, যে মূল উপাদানে এই স্থুল বাহ্যজগৎ নিৰ্ম্মিত অথবা যাহা আমাদের ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য এবং মন ও বুদ্ধি দ্বারা যাহা বোধগম্য হয় তাহাই জড় বা অনাত্মা। ইহা নিত্য জ্ঞেয়- স্বরূপ বিষয় (objective) ; আর চৈতন্যময় আত্মা (Spirit or mind) নিত্য জ্ঞাতাস্বরূপ বিষয়ী অথবা সকল বিষয়ের দ্রষ্টাস্বরূপ । এক্ষণে ইহার পার্থক্য এইভাবে বুঝিতে পারি যে, সচেতন আত্মাই জ্ঞাতা ও দ্রষ্টাস্বরূপ ; পক্ষান্তরে জড় বা অনাত্মা সৰ্ব্বদা দৃষ্ট, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এবং জ্ঞেয় পদার্থ ভিন্ন অন্য কিছু নহে। একটি কর্তাস্বরূপ এবং অপরটি কৰ্ম্মস্বরূপ । এতদুভয়ই পরস্পরের সম্বন্ধ সাপেক্ষ। একই বস্তুর অর্দ্ধাংশ এই স্থুল বাহ্যজগৎ, সমস্ত জড় বা অনাত্মা এবং উহার অপর অর্দ্ধাংশ মনোরাজ্য বা চৈতন্যময় আত্মা । সুতরাং জড়বাদীর মত- যাহা কেবল 'জ্ঞেয়' বিষয়ের অস্তিত্ব স্বীকার করে এবং বিষয়ী, আত্মা বা জ্ঞাতার অস্তিত্ব অস্বীকার করে তাহা একদেশী--ও অসম্পূর্ণ । জ্ঞাতা, আত্মা বা বিষয়ী আছে বলিয়াই জ্ঞেয় বিষয় বা অনাত্ম পদার্থের বিজ্ঞমানতা সম্ভবপর--এই সত্য জড়বাদ স্বীকারই করে না। 

    

    জড়বাদীদের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণরূপে ন্যায়যুক্তি-বিরুদ্ধ কারণ বিষয় ও বিষয়ী—জ্ঞেয় ও জ্ঞাতা এতদুভয়ের স্বরূপের বিভ্রমের উপর উহার ভিত্তি। জড়বাদ বলে যে, জড় বা অনাত্মা হইতেছে জ্ঞেয় বা জ্ঞানের বিষয় কিন্তু আবার তৎসঙ্গে ইহাও প্রমাণ করিতে চেষ্টা করে যে, এই জ্ঞেয় বিষয় হইতেই সেই জ্ঞাতা বিষয়ী উৎপন্ন হইয়াছে। ইহা কখনই হইতে পারে না। কারণ 'ক' কখনও 'ক' এর অভাব হইতে পারে না । জড় বা অনাত্মা, জ্ঞেয় পদার্থ বা জ্ঞানের বিষয় (objective) - এই ধারণাতে জড়বাদের আরম্ভ। কিন্তু পরিশেষে ইহা সিদ্ধান্ত করিয়া থাকে যে, এই জ্ঞেয়, জড় বা অনাত্মা বিষয় হইতেই বিষয়ী, জ্ঞাতাস্বরূপ আত্মার উৎপত্তি হইয়া থাকে। প্রথমে জড়বাদ স্বীকার করে যে, যাহা উপলব্ধির বিষয় অর্থাৎ যাহা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তাহাই জড় বা অনাত্মা ; পরে ক্রমশঃ ইহা প্রতিপন্ন করিবার চেষ্টা করে যে, উহাই আবার বিষয়ী (যিনি অনুভবকর্তা), উৎপাদক । এই সিদ্ধান্ত একেবারেই স্বমত-বিরোধী এবং অযৌক্তিক। জড়বাদ যেমন একদেশদর্শী এবং ভ্রমসঙ্কুল সেইরূপ অধ্যাত্মবাদ বা বিজ্ঞানবাদ যাহা অনাত্মা, বিষয় বা জড়ের অস্তিত্ব অস্বীকার করিয়া বলে যে, জগতের যাবতীয় বাহ্য বস্তু আমাদের মনের ভাব মাত্র, তাহাও একদেশীতা-দোষযুক্ত। 


    আধুনিক খ্রীষ্টিয় ধর্মবিজ্ঞান-সম্প্রদায়ের মতে সমস্ত বস্তুই মানসিক ভাব—সমূহ মাত্র ; জড় বা অনাত্মা কিছুই নাই—এই মতও জড়বাদীদের মতের ন্যায় একদেশী ও ভ্রমাত্মক। দৃশ্য বা জ্ঞেয় বিষয় না থাকিলে দ্রষ্টা' বা জ্ঞাতা বিষয়ী ( আত্মা যিনি সর্ব্বসময়ে কেবল অনুভব কৰ্ত্তা ) থাকিতে পারে না। যদি আমরা একের অস্তিত্ব স্বীকার করি তবে অপরটির অস্তিত্ব আছে ইহাই বুঝাইয়া থাকে। সুতরাং জার্ম্মাণ কবি ও দার্শনিক পণ্ডিত গেটে যাহা বলিয়াছেন, তাহা সত্য বলিয়া মনে হয়। তিনি বলেন যে, চৈতন্যময় আত্মা না থাকিলে জড় বা অনাত্মা থাকিতে পারে না এবং উহা কার্যক্ষম হয় না ; সেইরূপ জড় বা অনাত্মা না থাকিলে আত্মার অস্তিত্ত্বই থাকে না । 


    বিশ্বব্যাপী “অখণ্ড সত্ত্বা” আত্মা ও অনাত্মা, বিষয়ী ও বিষয় এই দুই গুণযুক্ত বলিয়া প্রতীয়মান হইয়া থাকে। এই দুইটি যেন সেই এক অব্যক্ত অজ্ঞেয় নিত্যস্বরূপের দুই প্রকার অবস্থাভেদ মাত্র। এই এক সত্ত্বাকে বেদে  “একং  সৎ” বলা হইয়াছে ৷ পাশ্চাত্য দেশের দার্শনিকগণ ইহার ভিন্ন ভিন্ন আখ্যা দিয়াছেন । ইউরোপীয় দার্শনিক স্পিনোজা "পারমার্থিক সত্ত্বা” বলিয়াছেন, ইংরেজ বৈজ্ঞানিক হার্বার্ট স্পেন্সার ইহাকেই “অজ্ঞেয় সত্ত্বা” বলিয়াছেন, জার্মাণ দার্শনিক ক্যান্টের ইহাই “সৰ্ব্বাতীত সত্ত্বা” । প্রাচীন গ্রীক-দার্শনিক প্লেটো ইহাকেই “সর্ব্বোত্তম” আখ্যা দিয়াছেন এবং আমেরিকান দার্শনিক এমার্শন ইহাকেই “পরমাত্মা” বলিয়াছেন; আর বেদান্ত মতে ইনিই “ব্রহ্ম” ; ইনিই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সেই সনাতন সত্যস্বরূপ—যাহা হইতে স্থুল, সূক্ষ্ম, জড় বা অনাত্মা, আত্মা সমস্তেরই উৎপত্তি। ইহা “একমেবাদ্বিতীয়ং” অর্থাৎ এক ও অদ্বিতীয় ; বহু নহে। সৃষ্টির প্রারম্ভে সর্ব্বপ্রকার জাগতিক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় সমূহ এই এক ব্রহ্ম হইতেই উদ্ভুত এবং প্রলয় কালে সমস্তই সেই ব্রহ্মেই বিলীন হইয়া যায়। এই অনন্ত আধার স্বরূপ ব্রহ্মে মায়া বা প্রকৃতি অভিন্নরূপে অবস্থিত ছিল এবং 'সেই প্রকৃতি হইতে প্রকাশমান যাবতীয় শক্তির উৎপত্তি হইয়াছে । এই প্রকৃতিকে আদ্যাশক্তি, মহামায়া, জগম্মাতা ইত্যাদি নাম দেওয়া হইয়াছে । পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের মতে আমরা জানিয়াছি যে, জগতের দৃশ্যমান শক্তিনিচয় পরস্পর আপেক্ষিকভাবে সংশ্লিষ্ট এবং ইহারা সেই সনাতন ব্রহ্ম ও তাহার নিত্যা প্রকৃতির অভিব্যক্তি মাত্র । 


    উপনিষদ্ বলেন :- “এতস্মাজ্জায়তে প্রাণো মনঃ সৰ্ব্বেন্দ্রিয়ানি চ। খং বায়ুর্জ্যোতিরাপঃ পৃথিবী বিশ্বস্য ধারিণী॥” - এই এক আকর হইতে প্রাণ, সর্ব্বপ্রকার মানসিক ক্রিয়া, ইন্দ্রিয় শক্তি, ইন্দ্রিয় গ্রহ বস্তু এবং ভৌতিক শক্তিসমূহ উদ্ভুত হইয়াছে ও নানাভাবে, নানা আকারে পরিবর্তিত হইয়া প্ৰকাশ পাইতেছে । [মুণ্ডক উপনিষদ (২/১/৩)] 

    ইহাই অদ্বৈতবাদ। বর্তমানকালে জার্ম্মাণ বৈজ্ঞানিক আর্নেষ্ট হেকেল প্রমুখ অদ্বৈতবাদিগণ স্বীকার করেন যে, ঐ নিত্য বস্তুই জড়, চেতন এবং সর্বপ্রকার শক্তিসমূহের উদ্ভবের হেতু। তাঁহারা বেদান্তের মহান্ সত্য “এতম্মাজ্জায়তে ইত্যাদি” স্বীকার করিয়াছেন। সেই এক অনন্ত ব্রহ্ম হইতে এক দিকে জীবনীশক্তি অর্থাৎ প্রাণ, মন, মানসিক ক্রিয়াসমূহ এবং ইন্দ্রিয়-শক্তিসমূহ-সমন্বিত জীবাত্মা উৎপন্ন হইয়াছে, অপর দিকে জড়রাজ্যান্তর্গত দেশ, আকাশ, বায়ু, অগ্নি, আপঃ, (তরল), পৃথিবী অর্থাৎ কঠিন (Solid) প্রভৃতি স্থূল পদার্থের উদ্ভব হইয়াছে। এক কথায়, সেই অনন্ত ব্রহ্ম হইতে একদিকে জীবাত্মার ও অপরদিকে অনাত্মা বা জড়ের বিকাশ-বেদান্তের এই অদ্বৈত-তত্ত্ব পাশ্চাত্য আধুনিক বিজ্ঞানবাদী পণ্ডিতগণও সমর্থন করিতেছেন। 'ম্যাটার' অথবা জড় পদার্থকে অতি সুক্ষ্মাবস্থায় বিশ্লেষণ করিলে তাহা উহার আধারভূত সেই অসীম ব্রহ্ম-সত্ত্বাতে পরিণত হইয়া থাকে । সেই জন্য বেদান্ত বলিয়াছেন যে, এই অসীম অনন্ত ব্রহ্ম-সত্ত্বাই নিখিল বিশ্বের অনাত্মা এবং আত্মা, জড় ও চেতন এই দুই ভাবের মূলে বিদ্যমান । সেই ব্রহ্মই বিশ্বের উপাদান ও নিমিত্ত কারণ । যদ্যপি ইহা এক ও অদ্বিতীয় তথাপি ইহা অনির্বচনীয় মায়াশক্তি প্রভাবে বহুরূপে প্রতীয়মান হইয়া থাকে। ইহাই বেদান্তের অদ্বৈতবাদ । 


    এই জগৎ কেবলমাত্র অচেতন পদার্থে রচিত নহে অথবা উহা পরমাণু সমষ্টির সমবায়ের ফলও নহে। এযাবৎ কাল পাশ্চাত্য প্রকৃতি-তত্ত্ববিৎ, রাসায়নিক এবং অপরাপর জড়বাদী- গণ বিশ্বাস করিতেন যে, পরমাণুসকল প্রত্যেকটি অবিভাজ্য পদার্থ ; উহারা এই অনন্ত আকাশ সমুদ্রে ভাসিতেছে এবং পরস্পরের আকর্ষণ-বিকর্ষণ শক্তির অধীন হইয়া ঘুরিয়া বেড়াই- বারকানে স্বতঃই যাবতীয় প্রাকৃতিক উপাদান উৎপাদন করিয়া এই পরিদৃশ্যমান জগতের সৃষ্টি করিয়াছে। কিন্তু এক্ষণে সুবিখ্যাত ইংরেজ বৈজ্ঞানিক, জে, জে, টম্‌সন্ বিদ্যুৎ- প্রবাহের সাহায্যে প্রমাণ করিয়াছেন, যে তথাকথিত অবিভাজ্য পরমাণুকেও সুক্ষ্মতর অংশে বিভক্ত করা যাইতে পারে। এইরূপ সূক্ষতর অংশকেই 'ইলেক্টণ' ও 'প্রটণ' বা বিদ্যুতিন বা বিদ্যুৎমাত্রা বলে; এবং ইহা প্রাচীন হিন্দু বৈজ্ঞানিকদিগের তন্মাত্রা বা শক্তিকেন্দ্র ভিন্ন অপর কিছুই নহে। যদি পরমাণু- গুলি 'ইলেক্টণে'র সমষ্টি হয় এবং ‘ইলেক্ট্রণ’গুলিই তন্মাত্রা বা শক্তিকেন্দ্র হয় তাহা হইলে ইহাদের আবাস স্থান কোথায় ? এই প্রশ্নের উত্তরে বেদান্ত বলেন যে, তাহারা পরিদৃশ্যমান শক্তি- সমূহ উদ্ভাবনকারী অব্যক্ত প্রকৃতির আধার সেই ব্রহ্ম স্বরূপ অনাদি অনন্ত কারণ সমুদ্রের মধ্যেই অবস্থিত। এক্ষণে আমরা বুঝিতে পারিতেছি যে, ‘ম্যাটার' জড় বা অনাত্মা ও শক্তি এক অদ্বিতীয় ব্রহ্মস্বরূপ মহাকারণের সহিত কিরূপ অভিন্নভাবে সম্বদ্ধ। এক অংশ হইতেছে ম্যাটার, বা জড়, জ্ঞেয়, বিষয় এবং অপরাংশ হইতেছে আত্মা—যাহাকে জ্ঞার্তা, বিষয়ী বলা হইয়াছে । 


    পূর্ব্বে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, ম্যাটার বা জড় অবিনাশী, অনাদি ও অসৃজ্য এই সিদ্ধান্ত পাশ্চাত্য বিজ্ঞানানুমোদিত । ম্যাটার বা জড় ও শক্তি নানারূপে পরিবর্তিত ও বিকৃত হইলেও ইহাদের ধ্বংস বা অত্যন্তাভাব কোন কালে হইতে পারে না। এক্ষণে জিজ্ঞাস্য এই যে, জড় ও শক্তি অর্থাৎ এই বিশ্বের অৰ্দ্ধাংশ যদি অবিনাশী ও অসৃজ্য হয়, অপরার্দ্ধের অর্থাৎ চেতন আত্মার ধর্ম্ম কিরূপ হইবে ? আত্মা কি বিনাশী ও সৃষ্ট পদার্থ ? ইহার সঙ্কত উত্তর এই যে, একার্দ্ধ যাহা জ্ঞেয়, বিষয় বা জড় তাহা যদি অবিনাশী ও অসৃজ্য হয়, তবে সেই একই বস্তুর অপরাদ্ধ চৈত্যময় আত্মা বা বিষয়ী কিরূপে সৃষ্ট এবং বিনাশী হইতে পারে ? ইহা স্বায়যুক্তির বিরুদ্ধ ও একেবারে অসম্ভব । সুতরাং জ্ঞাতা বা আত্মার স্বরূপ নিশ্চয়ই অসৃজ্য ও অবিনাশী স্বীকার করিতে হইবে। যদি জ্ঞেয়, জড় বা অনাত্মা 'নিত্য' অর্থাৎ অনাদি ও অনন্ত হয় তাহা হইলে উহার ঐ ধর্ম্ম সম্ভবপর করিবার জন্য জ্ঞাতা আত্মাকে নিত্য অর্থাৎ অনাদি ও অনন্ত স্বীকার করিতে হইবে। জ্ঞাতা স্বরূপ আত্মা নিত্য না হইলে জড় ও শক্তি যে নিত্য ইহা কে জানিবে ? এই প্রশ্নের উত্তর এবং ইহার মূল- তত্ত্বটি পাশ্চাত্য বিভিন্ন দেশের সুবিখ্যাত জড়বাদী বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক পণ্ডিতগণ আলোচনা করেন নাই। জ্ঞেয়, বিষয়, জড় ও শক্তির নিত্যত্ব স্বীকার করিবার পূর্ব্বেই জ্ঞাতা বা আত্মার নিত্যত্ব প্রথমে স্বীকার করিতে হইবে। একের নিত্যত্বের উপর অপরটিরও নিত্যত্ব নির্ভর করে—এই দুইটির মধ্যে যদি একটি অনিত্য হয় তাহা হইলে অপরটিও অনিত্য হইবে ; এবং দুইটির সম্বন্ধ নষ্ট হইয়া যাইবে। সুতরাং আত্মা এবং অনাত্মার সম্বন্ধে বিশ্লেষণ-বিচারের চরম সীমায় দেখা, যায় যে, উভয়েই অবিনাশ্য, অসৃজ্য এবং নিত্য। একই চুম্বকের একটি প্রান্তের গুণ যদি নিত্য হয়, তবে অপর প্রান্তটির গুণও স্বভাবতঃ নিত্যই হইবে ; অধিকন্তু চুম্বকের মধ্যস্থল অর্থাৎ উভয় প্রান্তগত ধর্ম্মের সন্ধিস্থলও নিত্যই হইবে। এই নিখিল বিশ্ব যেন একটি বিরাট চুম্বক উহার একটি প্রান্ত জড় বা অনাত্মা ; অপর প্রান্তটি আত্মা এবং সন্ধিস্থলটি সেই নিৰ্গুণ সত্ত্বা অর্থাৎ ব্রহ্ম। এই কারণ বশতঃ জড় বা অনাত্মা, আত্মা এবং ব্রহ্ম— এই তিনই নিত্য বস্তু। 


     বেদান্তশাস্ত্রে চৈতন্যময় বিষয়ী, দ্রষ্টা ও জ্ঞাতা স্বরূপকে আত্মা বলা হয়। ইহাই আমাদের যথার্থ স্বরূপ। ইহা অনাদি- কাল হইতে আছে এবং ভবিষ্যতে অনাদিকাল পর্যন্তও থাকিবে । কোন বস্তুই ইহার বিনাশ সাধন করিতে পারে না। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাহ্যজগতের আকার সকল পরিবর্তিত হইতে পারে, কিন্তু আত্মার কোনপ্রকার পরিবর্তন কখনও ঘটিবে না। ইহা সম্পূর্ণরূপে অপরি-বর্তনীয়। সেই কারণ গীতায় উক্ত হইয়াছে ;—“নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ। ন চৈনং ক্লেদয়ন্ত্যাপো ন শোষয়তি মারুতঃ॥” (দ্বিতীয় অধ্যায়, শ্লোক ২৩) — অস্ত্র ইহাকে ছেদন করিতে পারে না, অগ্নি ইহাকে দহন করিতে পারে না, জল ইহাকে দ্রব করিতে পারে না, এবং বায়ু ইহাকে শুষ্ক করিতে পারে না। ইহা অচ্ছেদ্য, অদাহ্য, অক্লেদ্য, অশোষ্য, নিত্য, অবিকার্য্য এবং অবিনশ্বর ; মৃত্যুকালেও ইহার নাশ হয় না। যাহা কিছু দেশ ও কালের অধীন তাহাই মরণশীল অর্থাৎ মৃত্যুর অধীন। যে সকল বস্তুর আকার আছে, তাহার মৃত্যুও আছে। “জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুঃ” জন্ম হইলেই মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী অর্থাৎ যাহার উৎপত্তি আছে তাহারই ধ্বংস আছে। আমাদের শরীরের জন্ম হইয়াছে, সেই জন্য ইহার মৃত্যু হইবে। কারণ, দেহের আকার দেশ ও কালের অধীন। কিন্তু আত্মার মৃত্যু হইতে পারে না, কারণ ইহা অজ অর্থাৎ জন্ম-রহিত এবং দেশকালাতীত অর্থাৎ দেশ ও কালের অধীন নহে। যদি আমাদের আত্মার উৎপত্তি বা জন্মের বিষয় অনুসন্ধান করিতে চেষ্টা করা যায় তাহা হইলে আমরা কখনও উহার উৎপত্তির সন্ধান পাইব না। সুতরাং আত্মা আদি-রহিত এবং অন্তহীন। যে সমস্ত পদার্থ আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তাহা- দের পরিবর্তন হইবে এবং কালে তাহাদের নাশও হইবে ; কিন্তু আত্মা চিরকালই একই ভাবে থাকিবে। 


    এখন জিজ্ঞাস্য হইতে পারে যে, এই চৈতন্যময় আত্মা এক অথবা বহু? এই একই প্রশ্ন জড় বা অনাত্মা সম্বন্ধেও জিজ্ঞাসা করা যাইতে পারেও যে, উহা এক অথবা বহু ? আমরা পূর্ব্বেই দেখিয়াছি যে জ্ঞেয়, বিষয়, জড় বা অনাত্মা যদিও দেশ এবং কালের অধীন হইয়া নানাভাবে প্রতীয়মান হইয়া থাকে তথাপি উহা পরমার্থতঃ একই বস্তু। বেদান্তমতে জ্ঞেয়, বিষয় যেমন একটিমাত্র সেইরূপ জগতের জ্ঞাতা, বিষয়ী বা আত্মা একটি- মাত্র আছে। সেই সর্বব্যাপী জ্ঞাতা বা পরমাত্মা এই নিখিল বিশ্বের আত্মা স্বরূপে বিদ্যমান; এবং ক্ষুদ্র জীবাত্মাসমূহ তাঁহারই ক্ষুদ্র অংশরূপে প্রকাশমান হইতেছে। * [মমৈবাংশো জীবলোকে জীবভূতঃ সনাতনঃ। মনঃষষ্ঠানীন্দ্রিয়াণি প্রকৃতিস্থানি কৰ্ষতি॥, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পঞ্চদশ অধ্যায়, শ্লোক ৭]  যে পরমাত্মা, পরমেশ্বর বা বিরাটপুরুষ—জীবাত্মারূপ অংশ সকলের পূর্ণ সমষ্টি, সেই বিরাট পুরুষই অনাদিকাল হইতে এই বিশ্ব- ব্রহ্মাণ্ডের একমাত্র বিষয়ী এবং জ্ঞাতা। তিনিই একমাত্র বিশ্বাত্মা, যাহাতে জীবাত্মাসমূহ অংশরূপে অবস্থান করিতেছে। তিনিই এক অদ্বিতীয় অনন্ত-সত্বারূপ সমুদ্র, যাহাতে অসংখ্য আবর্তের ন্যায় ব্যক্তিগত জীবাত্মা সমূহ বিরাজ করিতেছে। এই বিরাট পুরুষই প্রথমজঃ হিরণ্যগর্ভ বলিয়া ঋগ্বেদে বর্ণিত হইয়াছেন – “হিরণ্যগর্ভঃ সমবর্ততাগ্রে বিশ্ব্য ধাতা পতিরেক আসীৎ” অর্থাৎ ইনি বিশ্বের বিধাতা ও পতিরূপে ব্রহ্ম হইতে প্রথমে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। ইনিই নির্গুণ পরব্রহ্মের সর্ব্ব- প্রথম এবং সর্ব্বোচ্চ বিকাশ— সগুণ-ব্রহ্ম। ইনিই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উপাদান ও নিমিত্তকারণ । ইহাকে আশ্রয় করিয়া প্রকৃতি ক্রম- বিকাশ দ্বারা এই পরিদৃশ্যমান জগৎ প্রসব করিয়াছেন। এই ভাবটি গীতাতে বলা হইয়াছে, – “মম যোনিৰ্ম্মহদ্ ব্রহ্ম তস্মিন্ গৰ্ভং দধাম্যহম্।” [শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, চতুর্দশ অধ্যায়, শ্লোক ৩] ইনি জ্ঞাতা, বিষয়ী, আত্মা এবং চৈতন্যকে জ্ঞেয়, বিষয়, অনাত্মা ও জড় হইতে পৃথক করিয়াছেন । 


“যতো বা ইমানি ভূতানি জায়ন্তে। যেন জাতানি জীবন্তি। 

যৎ প্রয়ন্ত্যভিসংবিশন্তি। তদ্ বিজিজ্ঞাসস্ব। তদ্ ব্রহ্মেতি॥” 


—তৈত্তিরীয়োপনিষদ্ । 


    ইহা হইতে সমস্ত জগৎ উৎপন্ন হইয়াছে, ইহাতেই অবস্থান করিতেছে এবং অবশেষে ইহাতেই প্রবেশ করিবে । ইনি সৰ্ব্ব- শক্তিমান । সমস্ত জীব-সমষ্টির যত শক্তি থাকে, তদপেক্ষা ইনি অধিকতর ক্ষমতাশালী। আমাদের শক্তি অতিক্ষুদ্র – আমাদের জ্ঞান যেরূপ সীমাবদ্ধ, আমাদের শক্তিও তদ্রূপ সীমাবদ্ধ ; কিন্তু পরমেশ্বরের মহতী শক্তির কোন সীমা নাই। ইনি সর্বত্রই বিরাজ করিতেছেন এবং আমাদের প্রত্যেক আত্মার পশ্চাতেই অবস্থান করিতেছেন। ইনি জ্ঞানের অনন্ত আধার ; ইনিই আমাদের  আত্মার আত্মা। 

    এই পরমেশ্বরের পূজা ও ধ্যান করা আমাদের একান্ত কর্তব্য এবং ইহা করিলেই আত্মা ও অনাত্মার মধ্যে কি সম্বন্ধ তাহা আমরা বুঝিতে পারিব । 


“নিত্যোঽনিত্যানাং চেতনশ্চেতনানাং। 

একো বহুনাং যো বিদধাতি কামান্। 

তমাত্মস্থং যেঽনুপশ্যন্তি ধীরা। 

তেষাং শান্তিঃ শাশ্বতী নেতরেষাম্॥” 

—শ্বেতাশ্বতরোপনিষদ্ 


    ইনি সমস্ত অনিত্য নামরূপাদির মধ্যে একমাত্র নিত্যবস্তু। ইনিই সমস্ত চেতন পদার্থের মধ্যে একমাত্র চৈতন্যের আকর- স্বরূপ ; আবার ইনিই সেই এক বস্তুকে বহুভাবে প্রতিভাত করান এবং সকল জীবের অন্তরস্থিত সকল কামনা পূর্ণ করেন। যিনি ইহাকে হৃদয়াকাশে উপলব্ধি করিতে পারেন, তিনি এই জীবনেই নিত্যা শান্তি লাভ করেন।

 

“ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণ মিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে । 

পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে ॥” 

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥ 


    অনাদি অনন্ত ব্রহ্ম, ইন্দ্রিয়গোচর স্থুল এবং ইন্দ্রিয়ের অগোচর সুক্ষ্ম জগতের সমস্ত পদার্থই ব্যাপিয়া রহিয়াছেন । সেই পূর্ণস্বভাব অনন্ত ব্রহ্ম হইতে পরিদৃশ্যমান অনন্ত জগৎ বাদ দিলেও যাহা অবশিষ্ট থাকে, তাহাও সেই অনন্ত ব্রহ্ম। ইহাতে ব্রহ্মের পূর্ণতার কোন হানি হয় না । ওঁ শান্তি, শান্তি, শান্তি॥

Post a Comment

0 Comments